তোমাকে বলছি – ভালোবাসার গল্প

২৬ জানুয়ারী ২০১২, রাত ১১ টার কাছাকাছি
আরিয়েন ফোনে চ্যাট করছিলো। মূলত ফেসবুক ফ্রেন্ডদের সাথে। এমন সময় একটা আইডি তাকে নক করে চ্যাট এ। আরিয়েন জবাব দেয়। বেশ কিছুক্ষন কথা হয়। জানা যায় মেয়েটা আরিয়েন এর লেখা কিছু গল্প পরে আরিয়েন কে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলো। আরিয়েন মনে মনে অবাক হলো। মেয়েটা তার গল্পের ফ্যান? ভালোই। আরিয়েনের নিজের জন্য একটু গর্ব বোধ হলো। এর পর মেয়েটার সাথে বেশ কিছুক্ষন কথা হলো। এক পর্যায় এ আরিয়েন তাকে জিজ্ঞেস করলো “তুমি আর কতোক্ষন থাকবে?” মেয়েটা বললো “বেশিক্ষন না, একটু পর সব ফোন আসা শুরু হবে”।
-ফোন? কিসের ফোন?
-আজ আমার জন্মদিন, মানে ১২টায় আমার জন্মদিন শুরু হবে।
-ওহ তাই নাকি? অগ্রীম শুভ জন্মদিন।
-থ্যাঙ্ক ইউ।
এরপরই আরিয়েন এমন একটা কাজ করলো যেটা সে কেন করলো সে নিজেই জানে
না।
-তোমার ফোন নম্বর টা দেবে? তোমাকে জন্মদিনের উইশ করবো। প্রমিস কল দেবো
না। শুধু একটা এসএমএস দেবো। প্লিজ?
-আচ্ছা ঠিক আছে। এই নাও ০১*****১**৩।
-ওকে, আমি এস এম এস দেবো। আমার নম্বরটা রাখো। ০১*৫*****৪২।
-ওকে।
আরিয়েন চ্যাট অ্যাপ্লিকেশন বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকে। এমন কেন করলো সে? সে নিজেও জানে না। এর আগে সে কখনো এমন করে নি। অন্তত প্রথম পরিচয়ে কোন মেয়ের কাছ থেকে নম্বর চায় নি। যাই হোক, রাত ১২ টায় সব হিসাব হবে।

২৭ জানুয়ারী,রাত ১২টা।
ঠিক ১২ তা বাজার সাথে সাথে আরিয়েন ফোন দিয়েছে।
-হ্যালো? নিশা?
-[অপরপাশ থেকে ভাঙ্গা গলায় আওয়াজ পাওয়া গেলো] জ্বী, কে বলছিলেন?
-আমি আরিয়েন। আরিয়েন চৌধুরী।
-ওহ, বলো।
-হ্যাপি বার্থডে টু ইউ। ইউশ ইউ এ ভেরি ভেরি হ্যাপি রিটার্ন অব দ্যা ডে।
-ওহ, থ্যাঙ্ক ইউ।
-তোমার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। মনে হয় নেটওয়ার্ক প্রবলেম।
-না, আমার ঠান্ডা লেগেছে। গলা ভেঙ্গে গেছে। তাই।
-ওহ, তাহলে তো তুমি কথা বলতে পারবে না।
-হুম, এক কাজ করি। আমি কাল তোমাকে ফোন দেবো। ঠিক আছে?
-ওকে, যাই হোক ভালো থেকো।গুডনাইট।
-গুডনাইট নয় আরিয়েন। বলো শুভরাত্রি।
-ওকে, শুভরাত্রি।

আরিয়েন ফোন রেখে অবাক হলো। নট ব্যাড।

২৭ জানুয়ারী বিকেল,২০১২
আরিয়েন কম্পিউটার এর সামনে বসে আছে। মূলত সে সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে পরে থাকে। সেটাই তার কাজ। পড়াশোনা করছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এবং এথিক্যাল হ্যাকিং নিয়ে। তাই তার জগৎ বলতে শুধু এই কম্পিউটার।
ফোন বেজে উঠলো। তাকিয়ে দেখে নিশা।
-হ্যালো, নিশা
-হ্যালো আরিয়েন, কি অবস্থা?
-এই তো? তোমার কি অবস্থা? কি করো?
-বিকেলে বের হয়েছে ঘুরতে ফ্রেন্ডদের সাথে। তুমি কি করো?
-এই তো কম্পিউটার এর সামনে বসে আছি।
-তুমি বিকেলে বাহিরে যাও না?
-যাই মাঝে মাঝে। যেটাকে বাংলায় বলে কালে ভদ্রে আরকি।
-ওহ, আচ্ছা ঠিক আছে আরিয়েন। তুমি কাজ করো। পরে কথা হবে।

৩১ জানুয়ারী,২০১২
সেই দিন বিকেলের পর নিশা আর ফোন দেয়নি। আরিয়েনের কেমন যান অস্থির অস্থির লাগছিলো। সে না থাকতে পেরে, নিশাকে ফোন দিলো।
-কি ব্যাপার? ফোন দাওনি কেন এতো দিন?
-আরে আর বলো না, বাসা থেকে ভার্সিটিতে যাচ্ছি।
-ভার্সিটি?
-ওহ, তোমাকে তো বলা হয়নি, আমি নোয়াখালি সাইন্স এন্ড টেকনোলজি ভার্সিটিতে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড এ্যাপ্লাইড কেমিষ্ট্রিতে পড়ি।
-ওহ, থাকো কোথায় ওখানে?
-হলে থাকি। এখনো সিট পাইনি। ডরমেটরী তে সবাই আস্তানা বানিয়ে আছি। রুম পেলে রুমে উঠে যাবো।
-এখন কোথায়?
-মাত্র নামলাম গাড়ি থেকে। এখন নোয়াখালি তে।
-ওহ, ঠিক আছে। তাহলে হলে যাও। পরে কথা বলি। তোমার সাথে মনে হয় ব্যাগ আছে। আগে ওগুলো রেখে আসো। পরে কথা হবে।
-হুম, ঠিক আছে পরে কথা হবে।

এর পর থেকে আরিয়েনের জীবনে নতুন এক অধ্যায় এর শুরু হয়। ধিরে ধিরে নিশা আরিয়েনের জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ টা দখল করে নেয়। আরিয়েনের সব কিছুতেই তার নজরদারী। ঠিক মতো খেয়েছে কিনা, ঘুমিয়েছে কিনা, এতো রাত জাগে কেন, আরিয়েনের এতো কি কাজ সারা দিন কম্পিউটার এর সামনে। ইত্যাদি। আরিয়েনের জীবনে সব কিছু বদলে যেতে থাকে।এক দিন বিকেলে নিশা বলে,

-তুমি আকাশ দেখো?
-আকাশ? মানে sky আকাশ এর কথা বলছো?
-এটা ছাড়া আবার কোন আকাশ এর কথা বলবো? আর কোথায় আকাশ আছে?
-না আকাশ টিভি নামের একটা চ্যানেল ও আছে মনে হয়।
-উফ, সব সময় যান্ত্রিক কথা বার্তা, যাই হোক তুমি আকাশ দেখো?
-আকাশ কেন দেখবো? আকাশ কি দেখার জিনিস?
-ঠিক, তোমার মতো লোকজন এই কথাই বলবে। আজ থেকে প্রতিদিন আকাশ দেখবে তুমি ৫ মিনিট করে।
-হোয়াট? কেন?
-কারন আকাশের বিশালতা মানুষের মন পরিষ্কার করে দেয়, মানুষকে অনেক বড় করে চিন্তা করতে শেখায়।
-একটা কথা বলি। তোমার এ সব কথা শুনতে অনেক ভালো লাগে। কিন্তু এ্যাপ্লাই করতে গেলে বোকামো মনে হয়।
-তুমি দেখবা কিনা বলো?
-আচ্ছা বাবা দেখবো। ৫ মিনিট তো? ঠিক আছে। ৫ মিনিট এমন কিছু না।
-শুধু দেখার মতো করে দেখবা না, অনুভব করবা।
-অনুভব? আকাশ রে আবার অনুভব করে কেমনে?
-আচ্ছা আপাতত দেখো। নিজে থেকেই অনুভব করতে শিখে যাবে।
-সেটাই ভালো।

এর পর প্রতিদিন আরিয়েন আকাশ দেখে। কেন দেখে সে নিজেও জানে না। শুধু জানে তাকে নিশা আকাশ দেখতে বলেছে, তাই সে দেখে। কয়েকদিন পর সে বুঝতে পারলো আকাশ দেখা কোন অনর্থক কাজ নয়। আকাশ দেখতে দেখতে মন কেমন যেন হালকা হয়ে যায়। ঠিক অনুভূতি টা বর্ননা করা সম্ভব নয়। শুধু এটা বোঝা যায় যে এভাবেই আকাশ কে অনুভব করতে হয়। আরিয়েন ক্রমশ বদলাচ্ছে।

কয়েকদিন পর আবার এক দিন,
-আরিয়েন, তুমি নামাজ পড়ো না?
-নাহ, পড়া হয়না।
-তুমি আজানের জবাব দাও?
-শুনতে পেলে দেই।
-শুনতে পেলে দেই মানে? এটা কি ধরনের উত্তর?
-আরে আজব? আমি সারাদিন হেডফোন লাগিয়ে কাজ করি। বেশিরভাগ সময় আজান শুনতেই পাই না।
-এটা ঠিক না। আজ থেকে তুমি দিনে অন্তত তিন ওয়াক্ত আজান শুনবে। কোন ভাবেই মিস করা যাবে না
-মানে?
-মানে তুমি ঠিক তিন ওয়াক্ত যখন আজান দিবে তখন সব কাজ বন্ধ রেখে শুধু আজান শুনবে আর জবাব দেবে। মনে থাকবে?
-ওকে, থাকবে।
-আরিয়েনে প্লিজ আমি যেটা বলছি সেটা তুমি করবে। প্লিজ।

এর পর থেকে আরিয়েন নিয়মিত তিন ওয়াক্ত আজান শোনে। সব কাজ বন্ধ রেখে। তার আজান শুনতে ভালোই লাগে। মনে হয় চারপাশ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে বাতাসে। আরিয়েনে বদলে যাচ্ছে।

এর পর থেকে আরিয়েন নিশা ছাড়া কিছুই বোঝে না। সামান্য কিছু হলেই নিশার সাথে তার কথা বলা চাই ই চাই। কিন্তু নিশা পরীক্ষার কারনে ঠিক মতো কথা বলতে পারছিলো না। আরিয়েনের দিন কাটে প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে। দুইদিন, তিনদিন পর নিশার সাথে তার কথা হয়। কিন্তু তাও ৫-৬ মিনিট। আরিয়েন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে, কেন এতো কষ্ট?

এক রাতে নিশার সাথে কথায় কথায় প্রশ্ন ওঠে যে কার কেমন লাইফ পার্টনার চাই? নিশার বলে তার জীবন সঙ্গীর কেমন হতে হবে। আরিয়েন নিজের সাথে মেলাতে চেষ্টা করে। তখন সে প্রচন্ড একটা ধাক্কার সাথে বুঝতে পারে, সে নিশাকে ভালো বাসতে শুরু করেছে। সে রাতেই নিশা কথায় কথায় আরিয়েন কে বলে আরিয়েন কিভাবে প্রপোজ করবে কাউকে সেটা সে দেখতে চায়। আরিয়েন মনের মধ্যে অনেক আশা নিয়ে নিশা কে শোনায় সে কিভাবে প্রপোজ করবে। নিশা সব শুনে বলে মজা করে বলে তুমি রিজেক্টেড। আরিয়েন ও তখন হাসির মধ্যে সব উড়িয়ে দেয়। সেদিন আরিয়েন কেন যেন অনেক কষ্ট পায়। সে বুঝতে শুরু করেছে সে নিশাকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসতে শুরু করেছে।

ঠিক তার পরপরই নিশা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। ফোন দেয় না, ফোন দিলে ধরে না। ঠিক ৫ দিন পর নিশা ফোন দিয়ে বলে
-তোমাকে বলেছিলাম মনে আছে যে আমি পরীক্ষার পর ঠিক পাঁচ দিন কথা বলবো না?
-তুমি কি জান আমি কতো চিন্তায় ছিলাম?
-আরে বাবা আমি ঠিক আছি।বাসায় এসেছি তাই কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি না।চিন্তা করো না, আমি ঠিক আছি।
এতো টুকু বলেই সেদিনের মতো কথা শেষ। আরিয়েনের কেন যেন সমস্ত অস্ত্বিত্ব ভেঙ্গে কান্না পায়।

এর পর থেকে নিশার সাথে কথা বলা আরো অনিয়মিত হয়ে যায়। এর পর এক টানা দিন ১৯ দিন নিশার কোন খবর নেই। ফোন দিলে ধরে না, কখনো কখনো কেটে দেয়। ফেসবুকে মেইলের পর মেইল দেয় আরিয়েন। কোন জবাব নেই। আরিয়েন দিন দিন ভেঙ্গে পড়তে থাকে। কেন হচ্ছে এমন? কেন নিশা তার সাথে কথা বলছে না? এতো দিন এ তো তার হলে ফেরত আসার কথা? তাহলে?

শেষে আরিয়েন ঠিক করে সে নোয়াখালী যাবে নিশার সাথে দেখা করতে। আরিয়েন ফোন দেয়া তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু রিয়াদ কে। তাকে সব বলে। রিয়াদ বলে “চল দোস্ত, তোর ভালোবাসার ,মানুষ টাকে দেখাও হবে, সাথে অ্যাডভেঞ্চার ও হবে”।

কিন্তু আরিয়েন নিশার পুরো নাম আর ডিপার্টমেন্টের নাম ছাড়া কিছুই জানে না। শুধু জানে সে হলে থাকে। কোন হলে তাও জানে না। শুরু হয় আরিয়েন আর রিয়াদের অভিযান। আরিয়েন ইউজিসি থেকে খবর নেয় যে নোয়াখালি সায়েন্ড এন্ড টেকনলজি ইউনিভার্সিটির ছাত্রী হল দুইটা। আর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এ্যাপ্লাইড কেমিষ্ট্রিতে মোট ছাত্র ছাত্রী আছে ২৬০ জন। কিন্তু ছাত্রী কতো জন সেটা জানে না। এখন এভাবে তো আর কোন পাবলিক ভার্সিটির হলে গিয়ে জিজ্ঞেস করা যাবে না যে নিশা নামের কেউ আছে নাকি? উলটে পাবলিকের ধোলাই খেতে হতে পারে। আরিয়েন এবার তার ব্রেইন চালায়। নিশার কষ্টে আরিয়েন ভুলেই গিয়েছিলো যে সে এখন প্রোগ্রামার। আরিয়েন একটা ওয়েবসাইট খোলে। সেখানে ভার্সিটি তে ভর্তি এবং পরবর্তি কাজ সমূহ সম্পর্কে তথ্য দেয়া আছে। সেখানে আরিয়েন উল্লেখ করে যে তাদের টিম সকল ভার্সিটিতে গিয়ে সরজমিনে তথ্য নিয়ে আসে। কোন ভার্সিটিতে কি রকম পরিবেশ সেটা সেখান কার ছাত্র ছাত্রীদের সাথে স্বশরীরে কথা বলে দেখা হয় এবং সেটা ওয়েবসাইট দেয়া হয়। আরিয়েন আর রিয়াদ সাইটের নামে দুইটা আইডি কার্ড বানায়। এর পর পোষ্ট মেইলের মাধ্যমে ভার্সিটির চ্যান্সেলর এর কাছে একটা অনুমতি পত্র পাঠায় যেখানে ভার্সিটির ভেতরে ছবি তোলা এবং ছাত্র ছাত্রীদের হল পরিদর্শন এবং তাদের সাথে কথা বলার অনুমতি চাওয়া হয়। সেটা সাইন হয়ে ফেরত আসা মাত্র রিয়াদ আর আরিয়েন রওনা হয় তাদের মিশনে।

সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিলে সময়ে হবে না তাই আগের রাত্রেই রিয়াদের গাড়ি নিয়ে রওনা দেয় আরিয়েন আর রিয়াদ। রিয়াদ ড্রাইভ করছে। আর সারা রাস্তা আরিয়েন ভাবতে থাকে কি হবে কাল সকালে নিশার সাথে দেখা করার সময়।

সকাল গিয়ে আগে ভাগেই ছেলেদের হল গুলতে কোন রকম এ একটা দায়সারা টহল দেয় ওরা। সেখানে সময় নষ্ট করা যাবে না। এর পর মেয়েদের হল। প্রথম হলে প্রায় ১ ঘন্টা সময় কাটালো। এর মধ্যে সেই অনুমতি পত্র দেখিয়ে হলে কে কে থাকে তাদের একটা লিষ্ট ও বের করে নিয়েছে ওরা। প্রথম হলে নিশা নামের কেউ নাই। তবে অনেক সময় দেখা যায় অনেকে বান্ধবীদের সাথেও হলে থাকে, সে সিট না পেলেও। তাই ওরা বেশ কিছু ক্ষন ছিলো ওখানে। কিন্তু ভাঁড়ে মা ভবানী। পেলো না নিশার দেখা।

পরের হলে ঢোকার সময় আরিয়েনের বুকের মধ্যে কেমন করতে লাগলো। যেহেতু মেয়েদের হল মাত্র দুইটা তাহলে নিশা এই হলেই আছে। এখানেও লিষ্ট নেয়। কিন্তু এ লিষ্টেও নিশার নাম নেই। আরিয়েনের কেমন যেন লাগতে থাকে। তবুও অনেক সময় নিয়ে প্রায় ৭০ টা মেয়ের ইন্টারভিউ নেয় ওরা। নিশার দেখা নেই। প্রায় প্রতিটা মেয়েকেই কৌশলে জিজ্ঞেস করে নিশার কথা। নিশা নামের কারো অস্তিত্বই নেই নোয়াখালী সাইন্স এন্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অ্যাপ্লাইড কেমিষ্ট্রি ডিপার্টমেন্ট এ। আরিয়েনের চারপাশ কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসে। কে তাহলে নিশা? কেনই বা তাকে ভূল তথ্য দিলো?

গাড়িতে ওঠার পর গাড়ি ষ্টার্ট না দিয়ে রিয়াদ সিটে হেলান দিয়ে রেষ্ট নেয়। আরিয়েন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে, কে তুমি?

এখানেই অনেক সহজ ভাবে সবকিছুর শেষ হতে পারতো। কিন্তু হলো না। আরিয়েন ঢাকা ফিরে রাগের মাথায় ওর কম্পিউটার ভেঙ্গে ফেলে। মনিটরে হাত দিয়ে আঘাত করতে গিয়ে ওর হাতে বড় রকমের আঘাত লাগে। হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে বসে আছে বাসায় আরিয়েন। কিছুক্ষন পর রিয়াদ আসে।
-কিরে কি অবস্থা?
-বুঝিস না কি অবস্থা?
-দেখ দোস্ত, যে মেয়েকে তোর জীবনে এসে আবার চলে যায় তার জন্য এভাবে নিজেকে ধ্বংস করে ফেলার কোন মানে নাই।
-তুই বুঝবি না রে রিয়াদ। ওকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি ইয়ার। ওকে ভূলে যাওয়া আমার পক্ষে অন্তত সম্ভব না।
-তাহলে এখন কি করবি?
-ওকে খুজবো।

-কিন্তু কিভাবে? আমাদের হাতে যে সব লীড ছিলো সে সব তো ট্রাই করেছি। সব ভূল। এমন কোন তথ্য নেই যেটা দিয়ে ওকে খুজে বের করা সম্ভব।
-রিয়াদ দোস্ত আমি এতো সহজ এ হাল ছাড়তে পারি না।
-আরিয়েন, কলেজ লাইফে তোর খ্যাতি ছিলো যে তুই সহজে হার মানতে শিখিস নি। কিন্তু দোস্ত এবার আমাদের হাতে কোন ক্লু নাই যে আমরা নিশা কে খুঁজে বের করবো। তুই বল?
-জানি না দোস্ত, আমি শুধু জানি ওকে আমার খুঁজে বের করতেই হবে। যে কোন মূল্যে। ওকে আমার চাই।
এর মধ্যে আরিয়েন আবার ফোন বের করে নিশার নম্বর ডায়াল করে, ফোন বাজছে, কিন্তু প্রতিবারের মত কেউ ফোন ধরছে না। আরিয়েন হতাশ হয়ে ফোন টা রেখে দিতে যাবে এমন সময় রিয়াদ চেঁচিয়ে ওঠে,
-দোস্ত ক্লু আছে, ফোন।
-ফোন?
-হ্যাঁ, ওর ফোন নম্বর তো চেঞ্জ হয়নি। এখনো খোলা। ওর নম্বর টা ট্রাক করতে পারলেই কেল্লা ফতে।
আরিয়েন রিয়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মুখে হাসি এনে বলে
-দোস্ত তুই একটা জিনিস। চল শুরু করি।
-কিন্তু ট্রাক করবো তো বললাম। কিন্তু করবো কেমনে?
আরিয়েন জোরে হেসে ওঠে,
-ও হ্যালো, আপনার সামনে বসা এই ছেলেটা এথিক্যাল হ্যাকিং এ বি এস সি করছে। ভুলে গেলেন?

-ওহ কেমনে ভূলে যাই জনাব? আমাদের আরিয়েন সাহেব তো আবার এথিক্যাল হ্যাকার। তো কিভাবে শুরু করবি?
-জি এস এম নেটওয়ার্কের সার্ভার এ ঢুকতে হবে। গেটওয়ের ফায়ারওয়াল টা ব্রীচ করতে পারলেই মেইন সার্ভার এর রুট এক্সেস পাওয়া যাবে। পরে পাইথন এ কয়েকটা কমান্ড যেমন ধর একটা হাইড্রা কিংবা ওয়ার্ম ঢুকাতে পারলে মেইন ডাটাবেজ এ এক্সেস পাওয়া কঠিন হবে না।আমার মনে হয় ওরাকল ৯ ডাটাবেজ……

-বাবা আরিয়েন, আপনি এতক্ষন যা বললেন তার মধ্যে দুই একটা শব্দ ছাড়া আমি কিছুই বুঝি নাই। তবে মনে হলো বেশ কঠিন কাজ। পারবি তো?
– হা হা জানি তুই বুঝিস নি। তুই না একটু আগে বললি যে আরিয়েন কলেজ লাইফে হার মানতে শেখে নি?
-তাহলে শুরু করা যাক?
-চল।
আরিয়েন তো ডেক্সটপ কম্পিউটার এর মনিটর ঘুষি মেরে ভেঙ্গে ফেলেছে, এখন বসেছে ল্যাপটপ নিয়ে। আহত হাত নিয়ে ঝড়ের বেগে কীবোর্ডে হাত চালিয়ে যাচ্ছে। পাশ থেকে রিয়াদ বললো,
-দোস্ত এখানে আমার করার মতো কিছু আছে?
-কাগজ কলম নিয়ে বস। আমি যা যা বলবো লিখে ফেলবি।
-ওকে।
আরিয়েন বেশ কিছু হাবিজাবি শব্দ বললো। রিয়াদ কিছুই বুঝলো না। তবে কয়েকটা লাইন দেখে এলগরিদম ক্রিপ্টো মনে হলো।

মিনিট ৩০ পর আরিয়েন বললো,
-একটা ঠিকানা বলছি লিখে নে।
মিতালী এন্টারপ্রাইজ ৩৮০, রোড নং ২১,* নং সেক্টর, **রা, ঢাকা।
-এটা কি নিশার ঠিকানা নাকি?
-নাহ, যে দোকান থেকে সিমটা বিক্রি হয়েছে সেটার ঠিকানা। চল এখনি এক বার টহল দিয়ে আসি? কি বলিস?
-চল।

আরিয়েন এর তর সইছে না। সাথে সাথে আহত হাত নিয়েই বের হয়ে গেলো রিয়াদ এর সাথে। ঢাকা শহরের অসহনীয় যানজট পেরিয়ে প্রায় ২ ঘন্টা লাগলো পৌছাতে। প্রায় আরো ২০ মিনিট খোঁজার পর দোকান পেলো।সরাসরি দোকানদার কে জিজ্ঞেস করলো নম্বর টা তার এখান থেকে বিক্রি হয়েছে কিনা? দোকানদার কিছুতেই মুখ খুলবে না। আরেক বিপদ। কারন মোবাইল কোম্পানীর পলিসি অনুযায়ী দোকানদার কাষ্টোমার এর ইনফরমেশন কাউকে দেবে না। শেষে আরিয়েন মানিব্যাগ থেকে ১০০০ টাকার একটা নোট বের করতেই দোকান দার এর মুখে কথা ফুটলো। জানা গেলো কার সিম এটা এবং আরো বিস্তারিত।

গাড়িতে ফেরত এলো দুই বন্ধু। দুই জনের কান ভোঁ ভোঁ করছে। মাথা ঘুরছে। এমন টা হবে দুইজনের কেউই কল্পনা করেনি। রিয়াদ আরিয়েন এর দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসছে। তারপর বললো,
-দোস্ত, হিসাব কিতাব তো সব এলোমেলো হয়ে গেলো।
-হ্যাঁ দোস্ত। আমি তো শালা পুরা টাশকিত হয়ে গেলাম।
-এখন কি করবি?
-কি আর করবো? যেটা করার।
-সেটা কি?
– ভালোবাসবো।

বাসায় ফিরে রাত ১১ টার দিকে আরিয়েন একটা এস এম এস পাঠালো নিশার নম্বর এ। এস এম এস এ লেখা ছিলো ” কুসুম কাননে ফুটেছে যে ফুল, তারে ছিড়িতে নারি”। সাথে সাথেই একটা ফোন ব্যাক আসে।
-হ্যালো, আরিয়েন?
-কেমন আছো নিশা ওরফে তানিয়া জান্নাত?
-তুমি কিভাবে জানলে এতো কিছু?
-হৃদয় দিয়ে খুঁজেছি তোমায়। তাই জেনেছি।
কয়েক মূহূর্ত ওপাশ থেকে কোন সারা শব্দ নাই।
-তানিয়া?
-হুম।
-যোগাযোগ বন্ধ করলে কেন?
-আমার মনে হচ্ছিলো আমি তোমাকে ধোকা দিচ্ছি। এভাবে তোমার ভালোবাসা অর্জন করাটা আমার কাছে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা মনে হয়ছে। তাই নিঃশব্দে চলে যেতে চেয়েছিলাম তোমার জীবন থেকে।
-কিন্তু আমি যে তোমাকে ভালোবাসি।
-আরিয়েন এখন তুমি জানো আমি কে, তুমি ভালো বেসেছো নিশা নামের এক মেয়েকে। যে অনেক ভালো ছাত্রী, অনেক কেয়ারিং একটা মেয়ে। আজকে যে তোমার সাথে কথা বলছে সে নিশা নয়। তানিয়া। নিশার ভালোবাসা তানিয়া পেতে পারে না। পেলেও সে ভালোবাসার সত্যিকার এর হকদার তানিয়া নয়।

-আচ্ছা তোমরা সিদ্দিক স্যারের ছাত্রীরা এতো পাকাও কেন? এতো প্যাঁচ কেন কথায়?
-মানে?
-মানে হলো আমি ভালোবাসি ফোনের ওপাশে যে আমার সাথে কথা বলেছে, এখন বলছে তাকে। নাম যেটাই হোক না কেন, নীশা কিংবা তানিয়া, আই ডোন্ট কেয়ার।
-আরিয়েন
-তানিয়া, আমি যা বলার বলেছি। আর কিছু বলার নেই।
কয়েকমূহুর্ত ওপাশ থেকে কোন শব্দ হলো না। আরিয়েনের ধারনা কাঁদছে তানিয়া।
-আরিয়েন তোমার স্কুলের সেই দিন গুলোর কথা মনে আছে? তুমি একবার ফিজিক্স ল্যাবের ব্যাটারী শর্ট সার্কিট করে আর একটু হলেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছে?
-হা হা , সে সব কি আর ভোলা যায়?
-আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমাকে খুঁজে পাবেনা। খুঁজে পেলে কিভাবে?
– সেটা না হয় নাই বা শুনলে। কিছু কিছু গোপনীয়তা একান্তই নিজেই।
– আরিয়েন, আই লাভ ইউ।
– তানিয়া জান্নাত, তোমাকে বলছি, আই লাভ ইউ টু।

আরিয়েন তানিয়া কে না বললেও সে মনে মনে হাসলো কিভাবে সে তানিয়া কে খুঁজে বের করেছে সেটা ভেবে। দোকান দারের কাছে তানিয়ার ঠিকানা পেয়ে আরিয়েন তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলো। স্কুলের ক্লাস ৮ থেকে ওর সাথে পরতো তানিয়া। ও, রিয়াদ এবং তানিয়া একই স্কুলে ছিলো। পরে ও আর রিয়াদ যায় নটরডেম এ আর তানিয়া যায় মাষ্টারমাইন্ড এ । স্কুল লাইফের এক কবিতা প্রতিযোগিতায় তানিয়া কবিতার লাইন ভূল করে বলেছিলো “কুসুম কাননে ফুটেছে যে ফুল, তারে ছিড়িতে নারি” আসলে লাইন টা হবে ” কুসুম কাননে ফুটেছে যে কমল, তারে ছিড়িতে নাহি”। সেই থেকে সবাই তানিয়া কে এটা বলে খেপাতো। স্কুল লাইফে তানিয়ে আরিয়েন কে পছন্দ করতো এটা আরিয়েন জেনেছে কলেজ এ ভর্তি হবার পর। স্কুল লাইফে আরিয়েন ব্যাপক পপুলার ছিলো ক্লাসে। ওর নাম ছিলো মি.পপুলার। তাই প্রায় প্রতিটি মেয়ের সাথেই ওর ভালো ফ্রেন্ডশিপ ছিলো।

কখনো কাউকে আলাদা ভাবে দেখে নি। তানিয়াও ফ্রেন্ড গ্রুপে ছিলো। কিন্তু তাকে অন্য কিছু কখনোই ভাবে নি আরিয়েন। তাই তানিয়ার মনের ইচ্ছাটাও ধরতে পারে নি তখন। কলেজ এ ওঠার পর একদিন স্কুলের এক বান্ধবী আরিয়েন কে জানায় তানিয়া ওকে ভালোবাসতো। তখন তানিয়ার সাথে ওর যোগাযোগ ছিলো না তাই আর এ বিষয় টা আগায়নি। এতো দিন পর সে আরিয়েন এর কাছে এসেছিলো সেই ভালো বাসা নিয়ে। কিন্তু সাহস ছিলোনা সত্য বলে। তাই নিজের পরিচয় মিথ্যে দিয়ে আরিয়েন এর সাথে বন্ধুত্ব এবং পরে সে নিজের ভূল বুঝতে পারে। সে আরিয়েন এর মনে যে ভালো বাসা সৃষ্টি করছে সেটা শুধুমাত্র নিশা নামের একটা মেয়ের জন্য। তানিয়ার জন্য নয়। তাই সে আবার হারিয়ে যায়। কিন্তু ততোদিন এ আরিয়েন তাকে পাগল এর মতো ভালোবাসতে শুরু করেছে। এবং সেই ভালোবাসার জোরে তাকে খুঁজে বের করে আরিয়েন।

[ সত্য একটি ঘটনাকে কিছুটা পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করে উপস্থাপন, নাম, ঠিকানা সব কাল্পনিক। কারো সাথে মিলে গেলে তার জন্য অরীত্র আহমেদ দায়ী নয়।]

 

প্রথম প্রকাশিত ভালোবাসার ডাকপিয়ন পেজ থেকে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.