যৌন শিক্ষা, কতোটা জরুরী এবং আমরা কতোটা জানি?

নিজেকে জানো

লেখার শুরুতেই বলে দেওয়া দরকার, এই লেখাটা যৌন শিক্ষা নিয়ে। বাংলাদেশে অনেকেরই যৌন শিক্ষা নিয়ে নানা ধরনের মতবাদ আছে, সমস্যা আছে। আমি যতটা সম্ভব শালীনতা বজায় রেখে লেখার চেষ্টা করবো। তবে যদি কেউ চান, এই ওয়ার্নিংটা পড়েই বন্ধ করে দিতে পারেন।

আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রিয় ডট কম এর একটা লেখা চোখে পড়লো। স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে যৌন সুড়সুড়ি বিষয়ক বই বিতরণ! লেখাটা পড়েই মেজাজ খানিকটা খারাপ হলো। পুরো লেখা শুধু বই থেকে কোট করা। সাংবাদিকের যদি মনে হয়ে থাকে এই বইটা যৌন সুড়সুড়ি দিয়ে ভর্তি, তাহলে সেটার ব্যাখ্যা তার দেওয়া উচিৎ ছিল। এই ধরনের একটা শিরোনাম দিয়ে বাকি লেখা শুধু বই থেকে কোট করে কি ধরনের সাংবাদিক দ্বায়িত্ব পালন করা হয়েছে সেটা আমার মাথায় ঢুকলো না।

আমি আমার নিজের ব্লগ ঢুকেছিলাম অন্য একটা লেখা লিখতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনে হল এই বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার। বলা উচিৎ।

যারা আমার লেখা পড়ছেন, তাদের মধ্যে কয়জন বলতে পারবেন তারা সুস্থ যৌন শিক্ষা পেয়েছেন? আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি সংখ্যাটা শতকরা ৫ জনের বেশী না। আমি নিজেও যৌনতা বিষয়ে যা জানি, তার কোনটাই সুস্থ ভাবে আসেনি।

অসুস্থ যৌন শিক্ষা কি? খোলাখুলি কথা বলি। আপনি সেক্স বা যৌন মিলন সম্পর্কে কি জানেন? কিভাবে জানেন? ৯০% ই উত্তর দেবে তারা স্রেফ জানে। অবশ্যই তারা অলৌকিক কোন উপায়ে তো জানে নাই। নিশ্চয়ই কেউ তাদের বলেছে, কিংবা তারা কোথাও পড়েছে। কিংবা দেখেছে। এই শোনা, পড়া বা দেখার কোনটাই প্রাতিষ্টানিক ভাবে আসেনাই।

একটা ছেলে বা মেয়ে যখন বয়ঃসন্ধির মধ্যে দিয়ে যায়, তার শরীরে অনেক ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করে। পরিবর্তন যেগুলো সে আগে কখনো দেখেনি। তার লম্বা হওয়ার গতি বেড়ে যায়। মেয়েদের মাসিক শুরু হয়, তাদের স্তন এর আকার বৃদ্ধি শুরু হয়। ছেলেদের দাড়ি, মোচ বের হয়। উভয়েরই পিউবিক হেয়ার বা গুপ্ত কেশ গজানো শুরু হয়। তবে শারীরিক পরিবর্তন যতটা না হয়, তারচেয়ে বেশী চাপ যায় মনের ওপর দিয়ে।

ছেলেদের গলার স্বর চেঞ্জ হয়ে যায়। তারা কথা বলতে অনেকটা সংকোচ বোধ করে। হুট করে দাঁড়ি মোচ গজানোর কারণে মানুষের সামনে আসতে তাদের লজ্জা লাগে। আমি মেয়েদের ব্যাপারটা খুব একটা বলতে পারবো না, তবে যতোটুকু বুঝতে পারি তাদের অভিজ্ঞতা আরও খারাপ হয়। মাসিক শুরু হওয়ার ব্যাপারটা কোন মেয়েই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না। অনেকেই প্রথম প্রথম প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই শরীর থেকে এতো রক্ত বের হয়ে যাচ্ছে, যে কেউই ভয় পাবে। অনেকেই বাসায় ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারে না। দিনের পর দিন তারা প্রচণ্ড যন্ত্রণা ভোগ করে, কষ্ট করে। অনেক সময় না পেরে বাসায় বলে। কিংবা মায়েরা বুঝে ফেলেন।

এই পর্যন্ত সব কিছুই ঠিক আছে। সমস্যা হলে, বুঝে ফেলার পরে কি ঘটে? ছেলেদের ক্ষেত্রে দেখা যায় বাবা বা বড় ভাই একটা রেজার ধরায়ে দেয়, কিংবা টাকা দেয় কিনে নেওয়ার জন্য। মেয়েদের ক্ষেত্রে মায়েরা স্যানিটারি ন্যাপকিন ধরিয়ে দেয়, কিভাবে ব্যবহার করতে হয় শিখিয়ে দেয়। ঐখানেই শেষ, ফুল স্টপ।

ছেলেদের কেন দাড়ি মোচ গজাচ্ছে, কেন গলার স্বর পাল্টাচ্ছে এগুলো কখনওই ব্যাখ্যা করা হয়না। মেয়েদের ঋতুস্রাব কেন হচ্ছে বা এই রক্ত কোথা থেকে আসছে, বা তলপেটে কেন এতো ব্যাথ্যা হচ্ছে, এগুলো কখনো পরিষ্কার করা হয়না।  এগুলো স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া, এগুলোর মধ্যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, লজ্জা পাওয়ার কোন কারণ নেই, এগুলো ছেলেদের পাশে দাঁড়িয়ে বা মেয়েদের হাত ধরে কেউ কখনো বলে না। বলে না কারণ বাবা-মা বলতে লজ্জা পান, কিংবা নিজেরা ঠিকভাবে জানেন না। কিন্তু সন্তানকে এগুলো সম্পর্কে না বলে ঠিক কি ধরনের বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছেন, সেটার কোন ধারনা নেই তাদের।

এবার বলি বাংলাদেশে ছেলেরা / মেয়েরা কিভাবে যৌন শিক্ষা লাভ করে। মেয়েদের এ ব্যাপারে মায়েরা কিছুটা আইডিয়া দেন। কিন্তু তাদের পুরো আইডিয়াটাই থাকে এইটা খারাপ, এইটা একটা নিষিদ্ধ জিনিস, তোমার স্বামীই সাথেই শুরু জায়েজ। বিয়ের আগে যৌন সম্পর্কে স্থাপনের রিস্ক কি, কিংবা তার খারাপ সাইড গুলো কোথায়, সেগুলো কখনওই ব্যাখ্যা করা হয়না। ছেলেদের ক্ষেত্রে ফ্যামেলীর কাছ থেকে কোন ধরনের শিক্ষা আসে না। তারা ভেবেই নেই ছেলে হাওয়া থেকে সব জ্ঞান লাভ করে নেবে।

এরপর পুরো জিনিসটা বিস্তার লাভ করে হাইস্কুলে। স্কুলে দেখা যায় ক্লাসের কেউ একটা রগরগে চটি বই নিয়ে আসে ক্লাসে। এরপর পালা করে সবাই সেটা নিয়ে বাসায় বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে কিংবা বাথরুমে বসে পড়ে। তারা পরে গোপন প্রেমের কথা, বিকৃত যৌনতার গল্প। তাদের জ্ঞানের শুরুটাই হয় ভুল একটা দর্শন নিয়ে। এরপর যখন মোবাইল ফোন হাতে আসে, তখন একে অপরকে পর্ন ভিডিও শেয়ার করে। বাসা এসে সেগুলো দেখে। সেখান থেকে আরও কিছু ভুল ধারনার জন্ম হয়। তারা যেটা জানে না সেটা হল পর্ন এবং রিয়েলিটির মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। পর্ন এ যারা অভিনয় করে, তারা অভিনেতা। তারা অভিনয় করে। বাস্তবে তার কিছুই ঘটে না।

এর মধ্যে আর বিপদজনক এক ধরনের পর্ন আছে। বাংলাদেশে অনেক দিন ধরেই গোপনে রেকর্ড করা পর্ন ভিডিওর একটা বিশাল জনপ্রিয়তা আছে। অনেক গুলো আছে যেগুলো গোপন, অনেক আছে যেখানে মেয়েটা হয়তো না বুঝেই ভিডিও করতে রাজি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্ক বাঁচাতে ছেলের চাপে রাজি হয়েছে। এরকম অনেক ঘটনা আছে। আর এই ধরনের পর্ন সবচেয়ে বেশি বিপদজনক।

অনেকেই এই ধরনের পর্ন দেখে নিজেরা ভিডিও করতে উদ্যোগী হয়। অনেকে ক্ষেত্রে নিজের অজান্তেই অন্য কেউ এই ভিডিও গুলো লিক করে দেয়। এরপর যেসব ঝামেলা হবে সেগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম।

এই এতোগুলো সমস্যা, এর শুরু কোথায়? শুরুটা শৈশবে, বয়ঃসন্ধিতে। তখন যদি তারা জানতো যে যৌনতা কি, তাদের শারীরিক পরিবর্তন কেন হচ্ছে, তাহলে অনেক কিছুই এভয়েড করা যেতো। এই দ্বায়িত্ব টা বাবা-মার। যদিও আমাদের দেশের বাবা – মা তো পারলে মাটিতে মিশে যাবে এই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে। পারলে তো বাচ্চাকে ৬ মাস বয়সেই বুকের দুধ খাওয়ানো ছাড়িয়ে দেয়। ২ বছর পর্যন্ত যে খাওয়ানোটা জরুরী, এইটা তারা মানতেই চান না। পাপ হবে বলে বাচ্চাকে বঞ্চিত করেন অনেক পুষ্টি গুন থেকে।

এখন অ্যাকাডেমিক ভাবে যৌন শিক্ষার বিস্তার করা এই দেশে একটু ঝামেলার। আমার মনে আছে একবার নওগাঁ জেলা স্কুলে থাকতে আমাদের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সিদ্ধান্ত নিলেন উনি AIDS এর ওপরে সব ক্লাসে আলোচনা করবেন। উনার বয়স তখন ৩২-৩৫ এর মতো হবে। উনি আমাদের ক্লাসে এসে বোর্ডে AIDS লিখে কি বলবেন সেটা চিন্তা করতে গিয়েই হিমশিম খেয়ে গেলেন। অনেক কিছু ব্যাখ্যা করতে গেলেন, কিন্তু সামাজিক প্রতিবন্ধকতা যে কতোটা প্রবল, উনি নিজে সেটা সম্ভবত সেদিন অনুভব করেছিলেন। কথার মাঝে মাঝেই উনি থেমে যাচ্ছিলেন, ভাবছিলেন পরের শব্দ বা লাইনটা আমাদের জন্য উপযুক্ত হবে কিনা।

গ্রামের কোন স্কুলে যদি এসব নিয়ে আলোচনা করতে যাওয়া হয়, তাহলে গ্রামের লোকজন হয়তো শিক্ষককে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। একবার একটা গ্রামে দেখেছিলাম একজন স্বাস্থ্য কর্মী কয়েকজন মেয়েকে ব্যাখ্যা করছিলেন ঋতুস্রাব কি এবং কি কি করতে হবে। গ্রামের মহিলারা উনাকে গালি দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছিলেন, উনি নাকি গ্রামের মেয়েদের মাথা খারাপ করে দিচ্ছেন খারাপ খারাপ কথা বলে।

এরকম একটা পর্যায়ে যদি সুস্থ যৌন শিক্ষা দিতে হয়, সেটা দিতে হবে স্কুল লেভেল এ। কিন্তু ক্লাসে বসে যেহেতু দেওয়ার মতো মানসিক পরিপক্বতা এই জাতীর আসেনাই, তাই বই এর মাধ্যমে বাচ্চাদের নিজেদের মতো করে জেনে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া দরকার। এ ছাড়া আর কোন উপায় আপাতত দেখছি না। বাবা- মা ও কিছু বলছেন না, নিজেরা জানলে সেটার খারাপ দিক অনেক। তাই একটা বই এরকম একটা পরিস্থিতিতে আশীর্বাদ এর মতো কাজ করবে।

এবার আমার নিজের মতামত বলি, নিজেকে জানো বইটা আমি পড়েছি। যারা বই এর ভাষা নিয়ে কান্নাকাটি করছেন, তারা পারলে গিয়ে চটি পড়ে দেখেন। ঐটার ভাষা দেখলে এই বইয়ের ভাষা অমৃত মনে হবে। এখন যদি মনে হয় আপনার সন্তান বা ভাই বোন চটি পড়েই বেঁচে থাকুক, তাহলে তো আর কিছু বলার নেই। এই বইটাতে যতোটা সম্ভব বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে যৌন জীবন, বয়ঃসন্ধি এবং যৌন রোগ নিয়ে। আপনার হয়তো আপনার সন্তানকে কনডম এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানাতে বা জানতে দিতে সমস্যা থাকতে পারে, তবে যদি তার কোনদিন AIDS হয়, তার খানিকটা দায়ভার আপনার ঘাড়েও এসে পড়ে।

আর প্রিয় এই নিউজ করেছে নয়াদিগন্তের নিউজের ওপর ভিত্তি করে। নয়া দিগন্ত কোন লেভেল এর নিউজ পেপার সেটা জানা আছে, বছরের পর বছর ধরে ভুয়া নিউজ প্রচার করে কতো মানুষের জীবন গেছে এই নয়াদিগন্তের কারণে সেটার হিসেব আছে। নয়া দিগন্তকে ক্রেডিবল সোর্স হিসাবে ব্যবহার করার আর শিয়ালের কাছে মুরগী বর্গা রাখা একি ব্যাপার।

সেই সাথে প্রিয় নিউজের কাছেও আমার কিছু প্রশ্ন আছে। প্রিয় নিউজ কে বহু সময় মানুষ বহু ভাবে প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে এর গ্রাফিকাল এক্সপ্রেশন নিয়ে। তাদের নিউজের ধরন বা শিরোনাম করা নিয়ে। প্রিয় নিউজ যদি সেই যায়গায় অটল থাকতে পারে, তাহলে আজকে তাদের এই বিষয়টা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে সমস্যাটা কোথায়? দায়সারা সংবাদ প্রচার না করে সেটার মধ্যে মিনিংফুল কিছু রাখতে সমস্যাটা কোথায়?

অডিও ব্লগিং – ১৯৭১ এবং অকৃতজ্ঞ রাজাকার শূয়োরেরা

 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর পাশাপাশি আমাদের দেশের একদল শূয়োর আক্রমন করেছিলো দেশের নিরিহ মানূষকে। তাদের আমরা রাজাকার বলে চিনি। আজকে ৪৩ বছর পর, যখন আমরা তাদের বিচার করতে উদ্যত হয়েছি, তখন আমাদের আশে পাশের ছেলে মেয়েরা, তারাই আজকে এই রাজাকার – আলবদরদের ডিফেন্ড করছে। আমার দেশের বুকে জন্ম নিয়ে, এই দেশের সাথেই নিমখারামী করতে তাদের কি একবারও মনে প্রশ্ন জাগেনা?

বেশ্যা

রাস্তার এপাশে দাঁড়িয়ে ভাবছে তমাল, ঐপাশে যাবে কিনা। ঐপাশের এলাকাটা, সহজ বাংলায় যাকে বলে বেশ্যাখানা, শুদ্ধ বাংলায় পতিতালয়। তমাল এর আজ মন ভালো নেই, কিন্তু পতিতালয়ে যাওয়ার পেছনে কারন সেটা না। এইখানে যে মেয়েগুলো থাকে, তাদের জীবনটা তমালের কাছে একটা রহস্য মনে হয়। এই মেয়েগুলো, নিজের শরীর ঘন্টার জন্য তুলে দিচ্ছে কারো হাতে, আজ এর হাতে, কাল ওর হাতে। প্রতিদিন নতুন নতুন মানূষ, নতুন নতুন অত্যাচার। এরপর রংচঙ্গে সাজ দিয়ে আবার দাঁড়িয়ে থাকে নতুন খদ্দরের আশায়। এদের মনের মাঝে কি চলে? খুব জানতে ইচ্ছে করে তমালের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়না, কারন সমাজের চোখে সে ভদ্রলোকের ছেলে। সে চার দেওয়ালের মাঝে কোন মেয়ের কাছে নিজের শরীরের চাহিদা পুরন করতে পারে, কেউ কিছুই বলবে না। কিন্তু পতিতালয় নামের এই জায়গাটাতে যখন সেই একই চাহিদা পয়সা দিয়ে পূরন করতে যাবে, তখন সেটা সমাজের চোখে অনেক বড় অপরাধ। একই দৃশ্য যখন সাজানো ডিষ্টেম্পার করা ঘরের মাঝে চিত্রায়িত হচ্ছে, তখন শারীরিক ক্ষুধা, আর সেটাই যখন বেশ্যালয় নামের প্রতিষ্টানে প্রাতিষ্টানিক ভাবে চিত্রায়ত হচ্ছে, তখন সেটা মহা সামাজিক অপরাধ।

আজ আর দ্বিধা দন্দে ভুগছে না তমাল। সোজা গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। দুই পাশে সারি সারি চাটাই দিয়ে তৈরী ঘর। কিছু ঘরের সামনে কড়া রঙ এর সাজ দিয়ে কতোগুলো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু ঘরের দরজা বন্ধ। দুইপাশে তাকিয়ে হাঁটতে থাকলো তমাল। সে আসলে জানে না সে কি চায়। হটাৎ একটা লুঙ্গি পড়া লোক এগিয়ে এলো। তার কথা শুনে বুঝলো ভদ্র ভাষায় সে একজন এজেন্ট, বাংলায় মাগীর দালাল। তার কথার কিছুই তমালের কানে যাচ্ছে না, সে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। লোকটা তার কাছে টাকা চাইলো, সে পকেট থেকে টাকা বের করে দিলো। লোকটা তাকে টেনে একটা ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো। হাতের মধ্যে কিছু একটা গুঁজে দিয়ে গেলো। দুইটা প্যাকেট। একটাতে রয়েছে জন্মনিরোধক, অন্যটা যৌন উত্তেজক এক ধরনের ঔষধ। ঘরের এক কোনে ছুড়ে ফেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো তমাল। চারপাশে জীবনের অনেক চিহ্ন ছিটিয়ে রয়েছে। একটা আলনায় কিছু জামা কাপড়। এক কোনে একটা ছোট টেবিল, তার ওপরে একটা আয়না, সস্তা দামের কিছু কসমেটিকস। খুব কড়া রঙ এর লিপিষ্টিক, চুলে বাঁধা ফিতে। এসব দেখতে দেখতেই ঘরের দরজা খুলে গেলো। একটা মেয়ে ঘরে ঢুকলো। দেখেই বুঝলো তমাল, একেই টাকা দিয়ে কিছুক্ষনের জন্য অর্জন করে নিয়েছে সে।

মেয়েটাকে দেখে বয়স আন্দাজ করার উপায় নেই। চেহারা আর চলাফেরা দেখে মনে হয় ১৪-১৫’র বেশি হবে না। কিন্তু কথা শুনে মনে হয় জীবনের অনেক বড় একটা অংশ অনেক কম বয়সেই দেখে ফেলেছে সে। তমাল এর দিকে এগিয়ে এলো মেয়েটা ধিরে পায়ে। সে জানে এই লোকটার হাতে তার নিজেকে সঁপে দিয়ে হবে কিছুক্ষনের জন্য। তবে তমাল তাকে এড়িয়ে দরজার দিকে যাচ্ছিলো। পেছন থেকে মেয়েটা তার হাত টেনে ধরলো।
-> চলে যাচ্ছেন যে?

মেয়েটার কথা শুনেই তমাল বুঝলো, মেয়েটা পড়ালেখা করেছে। শুদ্ধ ভাবে বাংলা বলছে। ভদ্র ঘরের মেয়ে। সেই সাথেই একগাদা প্রশ্ন উঁকি দিলো তমাল এর মনে।

~ আমি চলে যাচ্ছি।
-> যাবেন না প্লিজ। আপনি এখনি বের হয়ে গেলে মনসুর আমাকে টাকা দেবে না।
~ মনসুর?
-> যে আপনার কাছ থেকে টাকা নিলো। সে এখানকার দালাল। আপনি বের হয়ে যাওয়ার অর্থ আপনাকে আমি ঠিকমতো আনন্দ দিতে পারিনি। এরপর সে আমাকে আর ভালো কোন কাষ্টোমার এনে দেবে না। প্লিজ, চলে যাবেন না। আপনি টাকা দিয়ে আমাকে কিনে নিয়েছেন এক ঘন্টার জন্য। আপনার চাহিদা পূরন করে যান।
~ আমার কোন চাহিদা নেই তোমার কাছে।
-> তাহলে এখানে কেন আপনি? এটা ভালো যায়গা নয়। এখানে যারা আসে, তারা চাহিদা পূরনের জন্যই আসে।
~ আমি তো বললাম, আমার কোন চাহিদা নেই।
-> নেই ঠিকাছে। কিছুক্ষন বসুন। এরপর বের হয়ে যাবেন।

এগিয়ে গিয়ে বিছানার এক কোনে বসলো তমাল। এতোক্ষনে মেয়েটাকে ভালো করে লক্ষ করলো তমাল। চেহারায় একটা লাবন্য আছে, বা বলা চলে যেটুকু বাকি আছে। কোন শিক্ষিত ফ্যামেলীর মেয়ে বোঝাই যাচ্ছে।
~ নাম কি তোমার?
-> কুলসুম।
~ আমি সর্বজ্ঞানী না হলেও এতোটুকু নিশ্চিত বলতে পারি, কুলসুম তোমার আসল নাম নয়।
-> না নয়, তবে সেটা গুরুত্বপূর্ন নয়। গুরুত্বপূর্ন হলো, আমি কুলসুম নামেই পরিচিত এবং আমি একজন বেশ্যা !
~ তোমার কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে তুমি পড়ালেখা করেছ। এখানে কিভাবে এলে?
-> দেখুন, আপনি টাকা দিয়েছেন আমার দেহের জন্য। আমি কে কি, সেটার সাথে আপনার কোন দরকার নেই।
~ আমি টাকা দিয়েছি তোমার জন্য, মানে তোমাকে আমি এক ঘন্টার জন্য কিনে নিয়েছি। আমি তোমার দেহ দিয়ে স্বাদ মেটাবো নাকি গালগপ্পো করবো, সেটা আমার ব্যাপার।
-> তাতো বটেই। আমি তো একজন বেশ্যা, আমাকে শুতে বললে শুতে হবে, গল্প করতে বললে গল্প করতে হবে।
~ এভাবে না নিলেও চলে ব্যাপারটা। তুমিও একজন মানুষ।
-> হয় আপনি অনেক বড় একজন গাধা, নয়তো বিশাল বড় মিথ্যেবাদী। মানুষত্য টাইপের জিনিস এই বেশ্যালয়ের দেওয়ালের বাহিরের জিনিস। এর ভেতরে শুধু টাকা, দেহ আর মৃত মানূষের কারবার।

~ সত্যিকথা বলো, তুমি কে?
-> আমি? আমার আসল নাম রেহানা। চট্টগ্রামের একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। একদিন প্রাইভেট শেষ করে বাসায় ফেরার সময় কয়েকজন অতিরিক্ত ভালো মানব সন্তান আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এরপর তিন দিন রাত ধরে তারা আমার অনেক আদরযত্ন করে। বেশি আদরযত্নের ঠেলায় মরতে বসেছিলাম। মেডিকেল এর সামনে ফেলে যায়। তাদের আদর যত্নে গায়ে কাপড় ছিলো না। তাই এক ডাক্তার চেকাপ এর সময় আবার খানিকটা আদর যত্ন করলেন। বললেন কাউকে যাতে তার আদরের কথা না বলি। বললে সে আমার স্যালাইন এ বিষ মিশিয়ে দেবে। বাবা মা আসলেন অনেক পরে খবর পেয়ে। এর মধ্যে অনেকেই আদর যত্ন করার চেষ্টা করলেন, পারেনি। কোর্টে কেস হলো, প্রতিদিন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আমাকে বর্ননা দিয়ে হতো সেই তিন রাতের। প্রতিপক্ষের আইনজীবি আমাকে প্রশ্ন দিয়ে খোলা আদালতে ধর্ষন করতেন। আমি শুধু জবাব দিয়ে যেতাম। আমাকে জবাব দিতে হতো, সেই তিন রাত আমি উপভোগ করেছিলাম কিনা? আমার অনেক কথার পরেও সব শেষে প্রতিপক্ষের আইনজীবি প্রমান করার চেষ্টা করলেন, আমি আসলে খারাপ ড্রেস পড়ে ছিলাম। তাই সেই সব ভদ্র মানব সন্তান একটু সমাজ সেবা করেছে।

~ তারপর?
-> এরপর আর কি? এই দেশে আপনি দেওয়ালের পেছনে দুইশোজনের সাথে শুলেও আপনি নিজেকে সতি প্রমান করতে পারবেন, খোলা ময়দানে কেউ আপনার ওড়না টান দিলে পরের দিন আপনি আড়ালে আবডালে মাগী শব্দটা শুনতে পাবেন। সবাই আপনার রেট জিজ্ঞেস করবে। রাতে ফ্রী আছেন কিনা জিজ্ঞেস করবে। মামলাটা কোর্টে এখনো ঝুলে আছে। বাসায় এসে অনেকেই আদর যত্ন করার চেষ্টা করলো। প্রতিবেশীরা বললো আমার জন্য তাদের উঠতি বয়সের ভদ্র ছেলেরা খারাপ হয়ে যেতে পারে। রাগে দুঃখে পালিয়ে এলাম। পড়লাম মনসুর এর হাতে। এখানে এনে তুলে দিলো। শেষ পর্যন্ত মাগীই হয়ে গেলাম। এখন কাউকে রেট বলতে হয়না। ঐসব মনসুর সামলায়।

~ এখান থেকে চলে যেতে পারতে? থেকে গেলে কেন?
-> আপনি অনেক বড় বোকা। আপনি সেটা জানেন। বেশ্যালয় এর মেয়েদের সমাজে কোন দাম নেই। আপনি সমাজের বড় লোকদের সাথে শুলে আপনাকে সোসাইটি গার্ল বলবে। ছোটলোকদের সাথে শুলে আপনি বেশ্যা হয়ে যাবেন জনাব। বেশ্যাদের বুকে হাত দিয়ে সবাই চায়, কিন্তু বুকে আগলে রাখতে কেউই চায় না।

~ এখান থেকে যেতে চাও?
-> কে নিয়ে যাবে? আপনি?
~ যদি বলি আমি?
-> বেশ্যাদের কপাল এতোতা ভালো হয়না জনাব। আমার জীবনের গল্প শুনে এখন আপনার হয়তো খারাপ লাগছে, কাল রাতে আমার সাথে শোয়ার সময় ভাববেন, এ তো একটা বেশ্যা। পরশু যখন কেউ আপনাকে বলবেন একজন বেশ্যাকে ঘরে এনে রেখেছেন কেন, তখন ঠিকই জুতা মেরে তাড়িয়ে দেবেন। কিংবা যদিও বা সত্যিই আপনি ভালো মনে আমাকে বের করে নিয়ে যান এখান থেকে, আমি আমার নিজেকে চিনি। আমি শরীর বিক্রি করি। এই শরীরটা এতো বেশি বার বিক্রি করেছি যে, এর ওপর আমার নিজের নিয়ন্ত্রন নেই আর। আমি একটা রোবট এখন।
~ আমার সাথে যাবে?
-> না, আপনার সাথে গেলে যদি আমার সামনে অনেক সুন্দর দিন অপেক্ষা করে, তবুও যাবো না। কারন আপনাকে ঠকাতে তো পারবো না। বাজারের মেয়ে হতে পারি, কিন্তু সবাইকে পাওনাটা দিতে জানি। আপনার পাওনা আপনাকে দিতে পারবো না আমি।

আর কোন প্রশ্ন করলো না তমাল। অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। গেট দিয়ে বের হয়ে গেলো তমাল। একতা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলো তমাল, সমাজের চেয়ে বড় পতিতালয় আর কোথায় আছে?

[ এই কাহিনীর ওপর একটা শর্ট ফিল্ম করার ইচ্ছে ছিলো আমার। চাপা একটা ইচ্ছা। ডায়ালগ গুলো অনেক ইরোটিক। সুশীল মিডিয়ার আড়ালে এটা কোনদিনও আলোর মুখ দেখবে না জানি। আর ফিল্ম মেকিং আমার লাইন নয়। তবুও এই ইচ্ছাটা মনের মাঝে অনেকদিন থেকেই লালন করি। সুযোগ, সামর্থের অভাবে কোনদিন করা হবে কিনা জানিনা। তবে জীবনে একবার চেষ্টা করবো এটা বানানোর। পতিতালয়ের বেশ্যাদের পাশাপাশি সামাজিক বেশ্যাদের চেহারাটা দেখা এবং দেখানোটা দরকার ]

 

https://www.facebook.com/theoritro/posts/10203682022677616?ref=notif&notif_t=like

UTA Flight 772 এবং এক হৃদয় বিদারক স্মৃতি চিহ্ন

UTA Flight 772 মেমোরিয়াল

হুট করেই মাথায় ভূত চেপেছিলো বিদ্ধস্ত বিমান নিয়ে পড়াশোনা করার। পড়তে পড়তে হটাৎ চোখ পড়লো একটা আর্টিকেল এর ওপর। তেমন বিশাদ কিছু লেখা নেই। গুগল ম্যাপের একটা ডিরেকশন দেওয়া আছে। ম্যাপে ঢুকে দেখতে গেলাম, ঘটনা কি। এবং স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।

বিমানের বিধস্ত ফিউজিল্যাজ
বিমানের বিধস্ত ফিউজিল্যাজ

UTA Flight 772 ছিলো ফ্রেঞ্চ এয়ারলাইন্স এর যাত্রী পরিবহনকারী একটা ডিসি-১০ বিমান। ১৯৮৯ সালের ১৯ সে সেপ্টেম্বর, উড্ডোয়নের ৪৬ মিনিট পরে,  বিমানের কার্গো হোল্ডে একটা বোমা বিস্ফোরনের কারনে বিমানটি নাইজেরিয়ার কাছের সাহারা মরুভূমিতে বিদ্ধস্ত হয়। মারা যায় ১৭০ জন, যার মধ্যে ১৫৫ জন যাত্রী এবং ১৫ জন ক্রু। 

Continue reading

মৃত ভালোবাসা

যদি কান্না গুলো রাতের নিঃশব্দ গল্প হতো, তবে জীবনের মাঝে থাকতো আরও অনেক গুলো নির্ঘুম রাতের স্মৃতিকথা। মাঝের কয়েকটি নিসঙ্গ ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, আর হারিয়ে যাওয়া এক অচেনা মেয়ের গল্প। ঘামে ভিজে যাওয়া বালিশের মাঝে লুকিয়ে থাকা অনেক কষ্টের ইতিহাস। স্বপ্ন, বিলাসিতা, যখন জীবনের দুইটি শব্দের একই মানে হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝে যেতে হয়, চলে যাওয়ার এইতো সময়। এইতো নিঃশব্দে সব ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোর সময়। যার জীবনের অভিধানে চাওয়া পাওয়া সব সময় কষ্টের আরেক নাম, তার সব টুকু নিংড়ে ভালোবাসার অধিকার নেই, থাকে না। একটা দিন সে রাস্তায় ধারে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা লাশই হোক, আর কফিনের নিচে চাপা পড়া একটা প্রানহীন শবদেহই হোক না কেন, জীবন তাকে সব সময় খুন করে, তার তাজা রক্তের দাম ছাপার অক্ষরের এক বিন্দু কালির সমান নয়, তাই মৃত প্রেমিক সব সময় খবরের কাগজের ভেতরের কোন এক ছোট্ট অংশের মাঝে লুকিয়ে থাকে কয়েক লাইনের বিনিময়ে।

 

সেই লাইন গুলো বলেনা তার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কথা, বলেনা ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্নের কথা। বলেনা প্রেমিকার শেষ হাসির কথা, বলেনা এক গুচ্ছ মৃত গোলাপের কথা। কিংবা পুরনো হয়ে যাওয়া বিবর্ন চিঠির কথা বলে না। আরও বলে না একটা কানের দুলের কথা, সযতনে গুছিয়ে রাখা সেই কানের দুলটার কথা, প্রেমিকার ফেলে যাওয়া শেষ স্মৃতির কথা। সেই লাইন গুলো বলে একটা নিথর দেহের কথা, বলে একজন মৃত মানূষের কথা। সে আজ কারও প্রেমিক নয়, আজ কারও ভালোবাসা নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই, নেই কাউকে ভালোবাসার ক্ষমতা। আজ শুধু লাশকাটা ঘরে পড়ে থাকা নাম ট্যাগহীন একটা লাশ সে, প্রেমিকার ছুড়ে ফেলে দেওয়া মৃত ভালোবাসার এক মাত্র সাক্ষী।